বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গত বছর খনিজ সম্পদ উত্তোলন খাতে বিগত ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক অধিগ্রহণ চুক্তি সই করেছে চীনা কোম্পানিগুলো। এ প্রবণতা বজায় রয়েছে চলতি বছরেও। আগামী কয়েক বছরে খাতটিতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রাসী বিনিয়োগের এ ধারা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টিকে চীনের বৈশ্বিক খনিজ সম্পদ উত্তোলন খাতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও দৃঢ় করার প্রয়াস হিসেবে দেখছেন তারা। ভূরাজনৈতিক বিরোধসৃষ্ট বাণিজ্যিক ঝুঁকি প্রশমনের উদ্দেশ্য থেকে দেশটির কোম্পানিগুলো এ অধিগ্রহণের সংখ্যা বাড়িয়ে তুলছে বলে অভিমত তাদের। খবর এফটি।
এসঅ্যান্ডপি ও মার্জারমার্কেটের তথ্যানুসারে, গত বছর চীনা খনি কোম্পানিগুলো বিদেশে ১০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যমানের ১০টি চুক্তিতে অংশ নিয়েছে, যা ২০১৩ সালের পর সর্বোচ্চ। পৃথক এক গবেষণায় গ্রিফিথ এশিয়া ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, বিদেশে খনি খাতে বিনিয়োগ ও অবকাঠামো কার্যক্রমে ২০১৩ সালের পর চীনের জন্য সবচেয়ে সক্রিয় বছর ছিল ২০২৪ সাল।
বিশ্বব্যাপী চলমান ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র সৃষ্ট সাম্প্রতিক শুল্ক বিবাদের অন্যতম লক্ষ্য চীন। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ অর্থনীতি নিজেদের উৎপাদন ব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখতে কিছু কৌশল হাতে রেখেছে, যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে দরকষাকষিতে ব্যবহার হচ্ছে। এর অন্যতম বিশ্ব অর্থনীতির মূলভিত্তি হিসেবে বিবেচিত কাঁচামাল ও হাল প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত দুষ্প্রাপ্য খনিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ। একাধিক পরিসংখ্যান অনুসারে, এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে গত বছর বিদেশে চীনা কোম্পানি খনি অধিগ্রহণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে।
উৎপাদন খাত বিস্তৃত হওয়ায় বিশ্বের বেশির ভাগ খনিজ পদার্থের বৃহত্তম ভোক্তা চীন। তাই দেশটির কোম্পানিগুলোর বিদেশী খনিতে বিনিয়োগের ইতিহাসও দীর্ঘ। বিশ্লেষক ও বিনিয়োগকারীদের মতে, গত বছর চুক্তি হার বাড়ার পেছনে আংশিক কারণ ছিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি। কারণ চীনা বিনিয়োগকে সুযোগ দিতে চায় না কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র।
প্রাইভেট ইকুইটি গ্রুপ অ্যাপিয়ান ক্যাপিটাল অ্যাডভাইজরির প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল স্কার্ব জানান, চীনা খানি কোম্পানিগুলো মনে করছে, সামনে খুব বেশি সুযোগ নেই। তাই ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে ওঠার আগেই যত বেশি সম্ভব অধিগ্রহণ শেষ করতে হবে।
খনি অধিগ্রহণের এ প্রবণতা চলতি বছরও অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি চীনের ঝিজিন মাইনিং ১২০ কোটি ডলারে কাজাখস্তানের একটি স্বর্ণখনি অধিগ্রহণে আগ্রহ দেখিয়েছে। এছাড়া চীনের বাইইন ননফেরাস গ্রুপের কাছে ৪২ কোটি ডলারে তামা ও স্বর্ণখনি মিনারাসাও ভালে ভার্দে বিক্রি করেছে ব্রাজিলের অ্যাপিয়ান।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের মেটালস অ্যান্ড মাইনিং বিভাগের বৈশ্বিক প্রধান রিচার্ড হরক্স-টেইলরের ধারণা, আগামী কয়েক বছর চীনের খনি কোম্পানিগুলোর উচ্চমাত্রার অধিগ্রহণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
চীনের বিদেশী বিনিয়োগ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও গ্রিফিথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক ক্রিস্টোফ নেডোপিলের মতে, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈদেশিক নীতির প্রধান ভিত্তি হিসেবে পরিচিত। তবে এর আওতায় বাস্তবায়িত পরিবহন ও অবকাঠামো প্রকল্পগুলো সাধারণত ছোট আকারে হয়। অন্যদিকে খনি ও প্রাকৃতিক সম্পদ খাতে বিদেশে চীনা বিনিয়োগ বরাবরই বড়। খনি অধিগ্রহণ হাই-টেক খাতে চীনের বাড়তি মনোযোগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষ করে ব্যাটারি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত এখন দেশটির অগ্রাধিকার।
চীন এরই মধ্যে দুষ্প্রাপ্য খনিজ, লিথিয়াম ও কোবাল্টের মতো অধিকাংশ কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে এসব কাঁচামালের বড় অংশই দেশটিকে আমদানি করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অনেক দেশ চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে চেষ্টা করছে। বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির ব্যাটারি, সেমিকন্ডাক্টর ও উইন্ড টারবাইনের মতো আধুনিক প্রযুক্তির জন্য অতিপ্রয়োজনীয় এসব খনিজ পদার্থ পেতে তারা বিকল্প সরবরাহ চেইন গঠনে সচেষ্ট। ব্যাটারি কাঁচামালবিষয়ক গবেষণা সংস্থা বেঞ্চমার্ক মিনারেল ইন্টেলিজেন্সের প্রধান অ্যাডাম ওয়েবের বলেন, ‘অনেক পশ্চিমা দেশ বিশেষ করে কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া এখন চীনা বিনিয়োগ নিয়ে ক্রমেই সন্দিহান হয়ে উঠেছে। কারণ এসব খনিজের বেশির ভাগই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।’
তথ্যানুসারে, পশ্চিমা প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছ থেকে খনি সম্পদ অধিগ্রহণে চীনা কোম্পানিগুলো এখন বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছে। কারণ তারা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অধিগ্রহণ করছে। এমনকি অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ দেশে বিনিয়োগ করতেও দ্বিধা করছে না তারা।
অ্যাপিয়ানের মাইকেল স্কার্ব বলেন, ‘বৈদেশিক অধিগ্রহণ কৌশলে চীনা ক্রেতাদের মধ্যে স্পষ্ট পরিপক্বতা এসেছে। আগে চীন সরকার বিদেশী সম্পদ ক্রয়ে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানিকে মনোনয়ন ও সমর্থন দিত। কিন্তু তিন-চার বছরে এ নীতিতে পরিবর্তন এসেছে। এখন তারা চীনা কোম্পানিগুলোকে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতার সুযোগ দিচ্ছে, যা বলছে পশ্চিমা প্রতিযোগীদের নিয়ে তারা এখন আর দুশ্চিন্তা করছে না।’
করপোরেট খাতে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসপি অ্যাঞ্জেলের বিশ্লেষক জন মেয়ারের মতে, চীন ইচ্ছাকৃতভাবে গুরুত্বপূর্ণ খনিজে আধিপত্য বজায় রাখছে। যাতে সেখান থেকে পশ্চিমাদের সরিয়ে রাখা যায়। যখনই অন্য কোনো ক্রেতা লিথিয়াম খনি কেনার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। তখনই চীনারা দ্রুত অর্থ নিয়ে ছুটে আসে।
বিদেশী খনি অধিগ্রহণে চীনের সবচেয়ে সক্রিয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সিএমওসি, এমএমজি ও ঝিজিন মাইনিং। চীনের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এসব কোম্পানিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াকরণ প্রকল্পে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঋণ দিচ্ছে।